Tafsir for this Ayah

Surah 18 : Ayah 16

Surah 18 : Ayah 16

وَإِذِ ٱعْتَزَلْتُمُوهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ إِلَّا ٱللَّهَ فَأْوُۥٓا۟ إِلَى ٱلْكَهْفِ يَنشُرْ لَكُمْ رَبُّكُم مِّن رَّحْمَتِهِۦ وَيُهَيِّئْ لَكُم مِّنْ أَمْرِكُم مِّرْفَقًا

When you have distanced yourselves from them and what they worship other than Allah, take refuge in the cave; your Lord will extend His mercy to you and make for you an easy way out of your ordeal.”

No Tafsir is available in the selected language for this Ayah. Showing an available text.

তাফসীর ইবনে কাসীর

১৩-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: এখান থেকে আল্লাহ তাআলা আসহাবে কাহফের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা শুরু করেছেন। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা সত্য দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়ে এবং হিদায়াত লাভ করে। কুরায়েশদের মধ্যেও এটাই ঘটেছিল যে, যবুকরা তো সত্যের আহবানে সাড়া দিয়েছিল, কিন্তু বুড়োদের মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া সবাই ইসলাম থেকে সরে পড়ে ছিল।বর্ণিত আছে যে, তারা ছিল খোদাভীরু, মুমিন এবং সুপথপ্রাপ্ত যুবকদের একটি দল। তারা তাদের প্রতিপালকের একত্ববাদে বিশ্বাসী ছিল। তারা তার তাওহীদের উক্তিকারী ছিল। দৈনন্দিন তাদের ঈমান ও হিদায়াত বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এই ধরণের আরো আয়াত ও হাদীসসমূহ দ্বারা দলীল গ্রহণ করে ইমাম বুখারী (রঃ) প্রভৃতি সম্মানিত মুহাদ্দিসগণ বলেন যে, ঈমান বৃদ্ধি হয়ে থাকে।

এর স্তরে হ্রাস বৃদ্ধি হতে থাকে। এখানে রয়েছেঃ “আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বৃদ্ধি করেছিলাম।" অন্য জায়গায় রয়েছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “হিদায়াত প্রাপ্তদের হিদায়াত বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।" (৪৭:১৭) অন্য আয়াতে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা ঈমান এনেছে তাদের ঈমান বাড়িয়ে দেয়।" (৯:১২৪) অন্য এক স্থানে আছেঃ (আরবী) অর্থাৎ “যেন তারা তাদের ঈমানের সাথে ঈমান আরো বেড়ে নেয়।” (৪৮:৪) কুরআন কারীমের এই বিষয়ের উপর আরো বহু আয়াত রয়েছে। বর্ণিত আছে যে, এই লোকগুলি হযরত ঈসা ইবনু মরিয়মের (আঃ) দ্বীনের উপর ছিলেন। এ সব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভাল জানেন। তবে বাহ্যতঃ জানা যাচ্ছে যে, এটা হযরত ঈসার (আঃ) পূর্বযুগের ঘটনা।

এর একটি দলীল এটাও যে, যদি ঐ লোকগুলি খৃস্টান হতেন, তবে ইয়াহূদীরা এতো মনোযোগ ও গুরুত্বের সাথে তাদের অবস্থাবলী অবহিত হতো না এবং অন্যদেরকে অবহিত করারও চেষ্টা করতো না। অথচ ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, মক্কার কুরায়েশরা তাদের দু'জন প্রতিনিধিকে ইয়াহূদী আলেমদের কাছে পাঠিয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, ইয়াহুদী আলেমরা যেন তাদেরকে এমন কতকগুলি কথা বলে দেয় যা তারা মুহাম্মদকে (সঃ) জিজ্ঞেস করবে। তখন ইয়াহুদী আলেমরা প্রতিনিধিদ্বয়কে বলেছিলঃ “তোমরা তাঁকে গুহাবাসীদের ঘটনা ও যুলকারনাইনের ঘটনা জিজ্ঞেস করবে এবং রূহ সম্পর্কেও প্রশ্ন করবে। এর দ্বারা জানা যাচ্ছে যে, ইয়াহুদীদের কিতাবে এর বর্ণনা ছিল এবং এই ঘটনা তারা জানতো।

এটা যখন প্রমাণিত হয়ে গেল। তখন এটা স্পষ্টভাবে বলা যেতে পারে যে, ইয়াহূদীদের কিতাব তো খৃস্টানদের কিতাবের পূর্বেকার। এসব ব্যাপারে আল্লাহ তাআলাই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।এরপর মহান আল্লাহ বলেনঃ “আমি তাদেরকে তাদের কওমের বিরোধিতার উপর ধৈর্য ধারণের ক্ষমতা দান করেছিলাম। তারা তাদের কওমের কোনই পরওয়া করে নাই। বরং তারা নিজেদের দেশ ত্যাগ করে এবং আরাম ও শান্তি সম্পূর্ণরূপে বিসর্জন দেয়।”পূর্ব যুগীয় কতকগুলি মনীষীর বর্ণনা রয়েছে যে, এই লোকগুলি রোমক ম্রাটের বংশধর এবং রোমের নেতৃস্থানীয় লোক ছিলেন। একবার তাঁরা তাদের কওমের সাথে উৎসব উদ্যাপন করতে গিয়ে ছিলেন। ঐ যুগের বাদশাহর নাম ছিল দাইয়ানুস।

সে অত্যন্ত উদ্ধত ও কঠোর প্রকৃতির লোক ছিল। সে সকলকে শিরকের শিক্ষা দিতো এবং মূর্তি পূজা করাতো। এই যুবকগণও তাদের বাপ-দাদাদের সাথে এই উৎসব মেলায় গিয়েছিলেন। তথাকার তামাশা দেখে তাদের মনে ধারণা জন্মে যে, মূর্তি পূজা নিছক বাজে কাজ। ইবাদত-বন্দেগী ও উৎসর্গ এক মাত্র ঐ আল্লাহর জন্যেই হওয়া উচিত যিনি আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও মালিক। সুতরাং এই লোকগুলি এক এক করে সেখান থেকে সরে পড়েন। তাদের একজন গিয়ে এক গাছের নীচে বসে পড়েন। পরে দ্বিতীয় জন, তৃতীয়জন, চতুর্থজন তথায় যান। মোট কথা, এক এক করে সবাই ঐ গাছের নীচে জমা হয়ে যান। অথচ একের অপরের সাথে কোন পরিচয় ছিল না।

শুধু ঈমানের জ্যোতি তাদেরকে এক জায়গায় মিলিত করে। হাদীসে রয়েছে যে, রূহসমূহও একটা একত্রিত সেনাবাহিনী। রোযে আযলে যাদের পরস্পরের মধ্যে পরিচয় ঘটেছিল, দুনিয়াতেও তারা মিলে মিশে থাকছে। আর সেই দিন যারা পরস্পর অপরিচিত ছিল, দুনিয়াতে এসেও তাদের মধ্যে মতানৈক্য থেকে যাচ্ছে। (এই হাদীসটি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে) আরববাসীরা বলে যে, এক জাতিত্ব হচ্ছে মিলজুলের কারণ।গাছের নীচে উপবিষ্ট ঐ যুবকগণ নীরব ছিলেন। তাদের একের অপর হতে ভয় ছিল যে, যদি তিনি মনের কথা বলে দেন তবে তার সঙ্গী তার শক্ত হয়ে যাবেন। কারোই কারো সম্পর্কে কোন খবর ছিল না। তাঁরা জানতেন না যে, তাদের প্রত্যেকেই নিজের কওমের অজ্ঞতাপূর্ণ ও শিরকপূর্ণ কাজে অসন্তুষ্ট।

অবশেষে তাদের মধ্যে একজন বুদ্ধিমান ও সাহসী যুবক সকলকে সম্বোধন করে বললেনঃ “ভাইসব! আপনারা সবাই যে, সাধারণ ব্যস্ততপূর্ণ জনসমাবেশ ছেড়ে এখানে এসে বসেছেন। আমি চাই যে, প্রত্যেকেই এর কারণ প্রকাশ করবেন যে কারণে তিনি স্বীয় কওমকে ছেড়ে এসেছেন।” তখন একজন বলে উঠলেনঃ “আমাকে তো আমার কওমের প্রথা, চাল-চলন ও রীতি-নীতি মোটেই ভাল লাগে না। আসমান ও যমীনের এবং আমাদের ও আপনাদের সৃষ্টিকর্তা যখন একমাত্র আল্লাহ তখন আমরা তাকে ছাড়া অন্যের ইবাদত কেন করবো?” তার এই কথা শুনে দ্বিতীয়জন বললেনঃ “আল্লাহর কসম! এই ঘৃণাই আমাকে এখানে এনেছে।" তৃতীয়জনও একথাই বললেন। যখন সবাই এই একই কারণ বর্ণনা করলেন, তখন সবার অন্তরেই প্রেমের এক ঢেউ খেলে গেল।

একত্ববাদের আলোকে আলোকিত প্রাণ এই যুবকবৃন্দ পরস্পর সত্য ও খাটি বন্ধুতে পরিণত হয়ে গেলেন এবং তারা সহোদর ভাইদের চেয়েও বেশী একে অপরের শুভাকাংখী হয়ে পড়েন। তাঁদের মধ্যে ইত্তেহাদ ও ইত্তেফাক হয়ে যায়। তারা তখন একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে নেন এবং সেখানে এক আল্লাহর ইবাদত করতে থাকেন। ক্রমে ক্রমে তাদের কওমের কাছেও তাদের খবর প্রকাশ হয়ে পড়ে। সুতরাং তাদেরকে ধরে ঐ অত্যাচারী বাদশাহর নিকট নিয়ে যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। বাদশাহ্ এ সম্পর্কে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে তারা অত্যন্ত সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে নিজেদের একত্ববাদ ও মাযহাবের বর্ণনা দেন। এমন কি, স্বয়ং বাদশাহ্ তার ভাষদবর্গ এবং সারা দুনিয়াকে এর দাওয়াত দেন।

তারা মন শক্ত করে নেন এবং পরিষ্কারভাবে বলে দেনঃ “আমাদের প্রতিপালক তিনিই যিনি আসমান ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা ও মালিক। তাকে ছাড়া অন্য কাউকেও মাবুদ বানিয়ে নেয়া আমাদের পক্ষে অসম্ভ। আমাদের দ্বারা এটা কখনো হতে পারে না যে, তাকে ছাড়া অন্য কাউকেও আহবান করবো। কেননা, শিরক একেবারেই বাজে কাজ। আমরা এই কাজ কখনো করতে পারবো না। এটা অত্যন্ত বাজে ব্যাপার, অনর্থক কাজ ও বক্র পথ। আমাদের এই কওম মুশরিক। তারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যদেরকে আহবান করছে এবং তাদের ইবাদতে নিমগ্ন রয়েছে। এর কোন দলীল প্রমাণ তারা পেশ করতে পারবে না। সুতরাং তারা মিথ্যাবাদী ও অত্যাচারী।” বর্ণিত আছে যে, তাদের স্পষ্টবাদিতায় বাদশাহ অত্যন্ত রাগান্বিত হয় এবং তাদেরকে শাসান-গর্জন ও ভয় প্রদর্শন করে।

সে নির্দেশ দেয়ঃ “তাদের পোষাক খুলে নাও। এরপরেও যদি তারা বিরত না হয়, তবে আমি তাদেরকে কঠিন শাস্তি প্রদান করবো।”বাদশাহর এই কথায় তাদের অন্তর আরো দৃঢ় হয়ে যায়, কিন্তু তারা এটা অবগত হয়ে যান যে, এখানে থেকে তারা দ্বীনদারীর উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। তাই, তারা কওম, দেশ এবং আত্মীয়স্বজন সবকে ছেড়ে দেয়ার দৃঢ় সংকল্প করেন। এই হুকুমও রয়েছে যে, মানুষ যেন দ্বীনের ভয়ের সময় হিজরত করে। হাদীসে রয়েছে যে, খুব সন্ত্র মানুষের উত্তম মাল হবে বীর পাল, যেগুলি নিয়ে সে পাহাড়ে-পর্বতে ও মরুপ্রান্তরে বসবাস করবে এবং স্বীয় দ্বীনকে রক্ষার জন্যে পালিয়ে বেড়াবে।

সুতরাং এইরূপ পরিস্থিতিতে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা শরীয়ত সম্মত। হাঁ, তবে যদি পরিস্থিতি এরূপ না হয় এবং দ্বীন নষ্ট হওয়ার ভয় না থাকে, তাহলে জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া শরীয়ত সম্মত নয়। কেননা, এমতাবস্থায় জুমআ ও জামাআতের ফজীলত হাত ছাড়া হয়ে যাবে। যখন এই লোকগুলি দ্বীন রক্ষার জন্যে এতো গুরুত্বপূর্ণ উৎসর্গে উদ্যত হন, তখন তাদের উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হয়। মহান আল্লাহ বলেনঃ “ঠিক আছে, তোমরা যখন তাদের দ্বীন থেকে পৃথক হয়ে গেছে তখন দেহ হতেও পৃথক হয়ে পড়। যাও তোমরা কোন গুহায় আশ্রয় গ্রহণ কর। তোমাদের উপর তোমাদের প্রতিপালকের করুণা বর্ষিত হবে। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের শত্রুদের দৃষ্টির অগোচরে রাখবেন।

তোমাদের কাজ তিনি সহজ করে দিবেন এবং তোমাদের শান্তির ব্যবস্থা করবেন।" সুতরাং এই লোকগুলি সুযোগ বুঝে এখান থেকে পালিয়ে যান এবং পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। দেখতে পাচ্ছিলেনা, অবশেষে তিনি কাফিরদের কালেমা নীচু করে দেন এবং নিজের কালেমা সুউচ্চ করেন। আল্লাহ মর্যাদাবান ও বিজ্ঞানময়।" সত্য তো এটাই যে, এই ঘটনাটি গুহাবাসীদের ঘটনা হতেও বেশী বিস্ময়কর ও অসাধারণ। একটি উক্তি এও আছে যে, কওম ও বাদশাহ ঐ যুবকদেরকে পেয়ে গিয়েছিল। যখন তারা তাদেরকে গুহায় দেখতে পায়, তখন তারা বলে ওঠেঃ “বাঃ! আমরা তো এটাই চাচ্ছিলাম।” অতঃপর তারা ঐ গুহার মুখটি একটি প্রাচীর দ্বারা বন্ধ করে দেয়, যাতে তারা ওর মধ্যেই মারা যান।

কিন্তু এই উক্তির ব্যাপারে চিন্তাভাবনার অবকাশ রয়েছে। কেননা, কুরআন কারীমে রয়েছে যে, সকাল-সন্ধ্যায় তাদের উপর সূর্যের আলো যাওয়া-আসা করতো ইত্যাদি। এসব ব্যাপারে মহান আল্লাহই সঠিক জ্ঞানের অধিকারী।

Tafsir in other languages · 7