এই আয়াতের তাফসীর

সূরা ৪ : আয়াত ১৬

সূরা ৪ : আয়াত ১৬

وَٱلَّذَانِ يَأْتِيَـٰنِهَا مِنكُمْ فَـَٔاذُوهُمَا ۖ فَإِن تَابَا وَأَصْلَحَا فَأَعْرِضُوا۟ عَنْهُمَآ ۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ تَوَّابًا رَّحِيمًا

আর তোমাদের মধ্যে (বিবাহিত কিংবা অবিবাহিত) যে দুজন এতে লিপ্ত হবে (প্রমাণিত হলে), তাদেরকে শাস্তি দাও। যদি তারা তাওবা করে এবং নিজেদেরকে সংশোধন করে নেয়, তবে তাদের (শাস্তি দেওয়া) থেকে বিরত থাকবে।(১০) নিশ্চয় আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।

তাফসীর ইবনে কাসীর

১৫-১৬ নং আয়াতের তাফসীর: ইসলামের প্রাথমিক যুগে এরূপ নির্দেশ ছিল যে, ন্যায়বান সাক্ষীদের সত্য সাক্ষ্য দ্বারা কোন স্ত্রীলোকের অশ্লীলতা প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে যেন বাড়ীর বাইরে যেতে দেয়া না হয় বরং জন্মের মত বাড়ীতেই যেন আটক রাখা হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে তাকে যেন ছেড়ে দেয়া না হয়। এটা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক বলেন-হ্যা তবে এটা অন্য কথা যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে কোন পথ নির্দেশ করে দেন। অতঃপর যখন অন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তখন পূর্বের ঐ নির্দেশ রহিত হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোকের জন্যে এ নির্দেশই ছিল। অতঃপর সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হলে বিবাহিতা নারীকে রজম করা অর্থাৎ প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং অবিবাহিতা নারীকে। একশ চাবুক মারার নির্দেশ দেয়া হয়।হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত সাঈদ ইবনে যুবাইর (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ), হযরত আতা' খুরাসানী (রঃ), হযরত আবু সালেহ (রঃ), হযরত কাতাদাহ (রঃ), হযরত যায়েদ ইবনে আসলাম (রঃ), এবং হযরত যহ্হাকেরও (রঃ) এটাই উক্তি যে, এ আয়াতটি রহিত হয়ে গেছে এবং এ বিষয়ে সবাই একমত। হযরত উবাদাহ ইবনে সামিত (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর যখন অহী অবতীর্ণ হতো তখন তা তাঁর উপর বড় ক্রিয়াশীল হতো এবং তিনি কষ্ট অনুভব করতেন ও তাঁর চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যেতো। একদা আল্লাহ তা'আলা স্বীয় নবী (সঃ)-এর উপর অহী অবতীর্ণ করেন। অহীর সময়কালীন অবস্থা দূরীভূত হলে তিনি বলেনঃ “তোমরা আমার কথা গ্রহণ কর। আল্লাহ তা'আলা তাদের জন্যে পথ নির্দেশ করেছেন।যদি বিবাহিত পুরুষ ও বিবাহিতা স্ত্রী ব্যভিচার করে তবে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে, অতঃপর প্রস্তরাঘাতে হত্যা করতে হবে। আর অবিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রী ব্যভিচার করলে তাদেরকে একশ চাবুক মারতে হবে এবং এক বছর নির্বাসন দিতে হবে। (সহীহ মুসলিম ইত্যাদি) জামেউত্ তিরমিযীর মধ্যেও এ হাদীসটি শব্দের পরিবর্তনের সাথে বর্ণিত আছে। ইমাম তিরমিযী (রঃ) হাদীসটিকে হাসান সহীহ বলেছেন। এ রকমই সুনান-ই-আবি দাউদেও রয়েছে।ইবনে মিরদুওয়াই-এর গারীব হাদীসে অবিবাহিত ও বিবাহিত পুরুষ ও স্ত্রীর এ নির্দেশের সাথে সাথে এও রয়েছে যে, যদি তারা বুড়ো বুড়ী হয় তবে তাদেরকে রজম করতে হবে। কিন্তু এ হাদীসটি গারীব। তাবরানীর হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “সূরা-ই-নিসা অবতীর্ণ হওয়ার পর আবদ্ধ রাখার হুকুম অবিশষ্ট নেই।' এ হাদীস অনুযায়ী ইমাম আহমাদ (রঃ)-এর মাযহাব এই যে, বিবাহিত ও বিবাহিতা ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে চাবুকও মারতে হবে এবং রজমও করতে হবে। আর জমহূরের মতে চাবুক মারতে হবে না, শুধু রজম করতে হবে। কেননা, রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত মায়েয (রাঃ)-কে এবং গামেদিয়্যাহ নারীকে রজম করেছিলেন কিন্তু চাবুক মারেননি। অনুরূপভাবে রাসূলল্লাহ (সঃ) দু’জন ইয়াহূদীকে রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং রজমের পূর্বে তাদেরকে চাবুক মারার নির্দেশ দেননি। সুতরাং জমহুরের এ উক্তি অনুযায়ী জানা যাচ্ছে যে, রজমের পূর্বে চাবুক মারার নির্দেশ রহিত হয়ে গেছে, সুতরাং এটা জরুরী নয়। অতঃপর বলা হচ্ছে-যদি দু’জন পুরুষ পরস্পর এ নির্লজ্জতার কাজ করে তবে তোমরা তাদেরকে শাস্তি প্রদান কর। অর্থাৎ তাদেরকে তিরস্কার কর, অপদস্থ কর, জুতো মার ইত্যাদি। চাবুক মারা ও রজব করার নির্দেশ দ্বারা এ নির্দেশও রহিত হয়ে যায়। হযরত ইকরামা (রঃ), হযরত আতা’ (রঃ), হযরত হাসান বসরী (রঃ) এবং হযরত আবদুল্লাহ ইবনে কাসীর (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থও হচ্ছে পুরুষ ও স্ত্রী। হযরত সুদ্দী (রঃ) বলেন যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে ঐ নব যুবকগণ যারা বিবাহিত নয়।হযরত মুজাহিদ (রঃ) বলেন যে, এ আয়াতটি ‘লাওয়াতের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কাউকে তোমরা হযরত লুত (আঃ)-এর কওমের কাজ করতে দেখলে তাকে এবং যার উপরে সে সেই কাজ করেছে তাকেও হত্যা করে ফেল।এরপর বলা হচ্ছে- যদি তারা উভয়ে এ কাজ হতে বিরত থাকে এবং সংশোধিত হয় তবে তোমরা তাদের উপর কঠোরতা অবলম্বন করো না। কেননা, পাপ হতে প্রত্যাবর্তনকারী নিস্পাপ ব্যক্তির মতই।অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন-“আল্লাহ তাওবা কবুলকারী, করুণাময়।' সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ যখন তোমাদের কারও দাসী ব্যভিচার করে তখন যেন সে তাকে চাবুক দ্বারা শাস্তি প্রদান করে এবং তার উপর আর যেন কোন শাসন গর্জন না করে। অর্থাৎ শাস্তি প্রদানের পর মনিব যেন তার দাসীকে আর কোন দোষারোপ না করে। কেননা, শাস্তি প্রদানই হচ্ছে পাপ মোচনের উপায়।
অন্য ভাষার তাফসীর · ৭