Tafsir for this Ayah

Surah 2 : Ayah 143

Surah 2 : Ayah 143

وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَـٰكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لِّتَكُونُوا۟ شُهَدَآءَ عَلَى ٱلنَّاسِ وَيَكُونَ ٱلرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيدًا ۗ وَمَا جَعَلْنَا ٱلْقِبْلَةَ ٱلَّتِى كُنتَ عَلَيْهَآ إِلَّا لِنَعْلَمَ مَن يَتَّبِعُ ٱلرَّسُولَ مِمَّن يَنقَلِبُ عَلَىٰ عَقِبَيْهِ ۚ وَإِن كَانَتْ لَكَبِيرَةً إِلَّا عَلَى ٱلَّذِينَ هَدَى ٱللَّهُ ۗ وَمَا كَانَ ٱللَّهُ لِيُضِيعَ إِيمَـٰنَكُمْ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ بِٱلنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ

Thus We made you a balanced nation, so that you may be witnesses over mankind and the Messenger a witness over you. We did not change your former direction of prayer [to the Ka‘bah] except to distinguish those who would follow the Messenger from those who would turn back on their heels. It was surely burdensome except for those whom Allah guided. Allah would never let your [acts of] faith go to waste, for Allah is Most Gracious and Most Merciful to all people.

No Tafsir is available in the selected language for this Ayah. Showing an available text.

তাফসীর ইবনে কাসীর

১৪২-১৪৩ নং আয়াতের তাফসীরবলা হয় যে, নির্বোধ লোক দ্বারা আরবের মুশরিকদের বুঝানো হয়েছে। একটি উক্তিতে ইয়াহূদীদের আলেমগণকে বুঝানো হয়েছে। আবার এটাও বলা হয়েছে যে, এর ভাবার্থ হচ্ছে মুনাফিকেরা। সহীহ বুখারী শরীফের মধ্যে হযরত বারা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মোল বা সতের মাস পর্যন্ত বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়েছেন। কা'বা ঘর তাঁর কিবলাহ্ হোক এটাই তাঁর মনের বাসনা ছিল। এর হুকুম প্রাপ্তির পর তিনি ঐদিকে মুখ করে প্রথম আসরের নামায পড়েন। যেসব লোক তাঁর সাথে নামায পড়েছিলেন তাদের মধ্যে একটি লোক মসজিদের পার্শ্ব দিয়ে যাচ্ছিলেন। তথায় তোক রুকুর অবস্থায় ছিলেন।

ঐ লোকটি বলেনঃ “আল্লাহর শপথ! আমি নবী (সঃ)-এর সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি।' একথা শুনামাত্রই ঐসব লোক ঐ অবস্থাতেই কা'বার দিকে ফিরে যান। কিবলা পরিবর্তনের নির্দেশের পূর্বে যাঁরা মারা গিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে বহু লোক শহীদও হয়েছিলেন। তাঁদের নামায সম্বন্ধে কি বলা যায় তা জনগণের জানা ছিল না। অবশেষে আল্লাহ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেন, আল্লাহ তা'আলা তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না।'সহীহ মুসলিমের মধ্যে এই বর্ণনাটি অন্যভাবে রয়েছে। তা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামায পড়তেন এবং অধিকাংশ সময় আকাশের দিকে দৃষ্টি উঠিয়ে নির্দেশের অপেক্ষা করতেন।

তখন (আরবি) (২:৪৪) এই আয়াতটি অবতীর্ণ হয় এবং কা'বা শরীফ কিবলাহ্ রূপে নির্ধারিত হয়। এই সময় মুসলমানদের মধ্যে কতকগুলো লোক বলেনঃ “কিবলাহ’ পরিবর্তনের পূর্বে যারা মারা গেছেন তাদের অবস্থা, যদি আমরা জানতে পারতাম! সেই সময় আল্লাহ তা'আলা (আরবি) (২:৪৩) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। আহলে কিতাবের মধ্যে কয়েকজন নির্বোধ এই কিবলাহ্ পরিবর্তনের উপর আপত্তি আরোপ করে। তখন আল্লাহ তা'আলা (আরবি) আয়াতটি অবতীর্ণ করেন। যখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) মদীনায় হিজরত করেন তখন বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ করা তাঁর প্রতি নির্দেশ ছিল। এতে ইয়াহূদীরা খুবই খুশী হয়েছিল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সঃ) হযরত ইবরাহীম (আঃ) -এর কিবলাহকে পছন্দ করতেন।

সুতরাং কিবলাহ্ পরিবর্তনের নির্দেশ দেয়া হলে ইয়াহূদীরা হিংসা বশতঃ বহু আপত্তি উত্থাপন করে। তখন আল্লাহ তা'আলা এই আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ “পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক হচ্ছেন আল্লাহ। এই ব্যাপারে যথেষ্ট হাদীসও রয়েছে।মোট কথা এই যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মক্কায় দুই রুকনের মধ্যবর্তী সাখারাই-বায়তুল মুকাদ্দাসকে সামনে রেখে নামায পড়তেন। যখন তিনি মদীনায় হিজরত করেন তখন ঐ দুটোকে একত্রিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই জন্যে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নামাযে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করার নির্দেশ প্রদান করেন। রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে এই নির্দেশ কুরআন কারীমের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল কি অন্য কিছুর মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে।

কোন কোন মুফাসসির বলেন যে, এটা তাঁর ইজতিহাদী বিষয় ছিল এবং মদীনায় আগমনের পরে কয়েক মাস পর্যন্ত তিনি ওর উপরই আমল করেন, যদিও তিনি আল্লাহ তা'আলার কিবলাহ পরিবর্তনের নির্দেশের প্রতি উৎসুক নেত্রে চেয়ে থাকতেন। অবশেষে তাঁর প্রার্থনা গৃহীত হয় এবং সর্বপ্রথম তিনি ঐদিকে মুখ করে আসরের নামায পড়েন। কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে যে, ওটা যুহরের নামায ছিল। হযরত আবু সাঈদ বিন আলমুয়াল্লা (রাঃ) বলেন, আমি ও আমার সঙ্গী প্রথমে কাবার দিকে মুখ করে নামায পড়েছি এবং ওটা যুহরের নামায ছিল। কোন কোন মুফাসসিরের বর্ণনায় রয়েছে যে, যখন নবী (সঃ)-এর উপর কিবলাহ পরিবর্তনের আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন তিনি বানী সালমার’ মসজিদে যুহরের নামায পড়ছিলেন।

দু'রাকআত পড়া শেষ করে ফেলেছিলেন, অবশিষ্ট দু'রাকআত তিনি বায়তুল্লাহ শরীফের দিকে মুখ করে পড়েন। এই কারণেই এই মসজিদের নাম হয়েছে মসজিদুল কিবলাতাইন' অর্থাৎ ‘দুই কিবলার মসজিদ'। হযরত নুওয়াইলা বিনতে মুসলিম (রাঃ) বলেনঃ “আমরা যুহরের নামাযে ছিলাম এমন সময় আমরা এ সংবাদ পাই, আমরা নামাযের মধ্যেই ঘুরে যাই। পুরুষ লোকেরা স্ত্রীলোকদের জায়গায় এসে পড়ে এবং স্ত্রীলোকেরা পুরুষ লোকদের জায়গায় পৌছে যায়। তবে ‘কুবা' বাসীর নিকট পরদিন ফজরের নামাযের সময় এ সংবাদ পৌছে।' বুখারী ও মুসলিমের মধ্যে হযরত আবদুল্লাহ বিন উমার (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, মানুষ ‘কুবা’র মসজিদে ফজরের নামায আদায় করছিল, হঠাৎ কোন আগন্তুক বলে যে, রাত্রে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর উপর কুরআন মাজীদের হুকুম অবতীর্ণ হয়েছে এবং কাবা শরীফের দিকে মুখ করার নির্দেশ হয়ে গেছে।

সুতরাং আমরাও সিরিয়ার দিক হতে মুখ সরিয়ে কা'বার দিকে মুখ করে নেই। এ হাদীস দ্বারা এটাও জানা গেল যে, কোন নাসিখের’ হুকুম তখনই অবশ্য পালনীয় হয়ে থাকে যখন তা জানা যায়, যদিও তা পূর্বেই পৌছে থাকে। কেননা এই মহোদয়গণকে আসর, মাগরিব ও এশার নামায আবার ফিরিয়ে পড়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি।এখন অন্যায় পন্থী এবং দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী ব্যক্তিরা বলতে আরম্ভ করে যে, কখনও একে এবং কখনও ওকে কেবলাহ্ বানানোর কারণটা কি? তাদেরকে উত্তর দেয়া হয় যে, হুকুম ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই। তোমরা যেদিকেই মুখ কর না কেন, সব দিকেই তিনি রয়েছেন। মুখ এদিকে ও ঐদিকে করার মধ্যে কোন মঙ্গল নিহিত নেই।

প্রকৃত পুণ্যের কারণ হচ্ছে ঈমানের দৃঢ়তা যা প্রত্যেক নির্দেশ মানতে বাধ্য করে থাকে। এর দ্বারা যেন মুসলমানদেরকে দ্রতা শিখানো হচ্ছে যে, তাদের কাজ তো শুধু আদেশ পালন। যে দিকেই তাদেরকে মুখ করতে বলা হয় সেদিকেই তারা মুখ করে থাকে। আনুগত্যের অর্থ হচ্ছে তার আদেশ পালন। যদি দিনে একশো বার ঘুরতে বলেন তবুও আমরা সন্তুষ্ট চিত্তে ঘুরে যাবো। আমরা তাঁরই অনুগত এবং তাঁরই সেবক। তিনি যেদিকেই আমাদের ঘুরতে বলবেন, সেই দিকেই আমরা ঘুরে যাবো। মুহাম্মদ (সঃ)-এর উম্মতের উপরে এটাও একটা বড় অনুগ্রহ যে, তাদেরকে আল্লাহর বন্ধু হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর কিবলার দিকে মুখ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যা সেই অংশী বিহীন আল্লাহর নামের উপর নির্মাণ করা হয়েছে এবং যদ্দ্বারা সমুদয় ফযীলত লাভ হয়ে থাকে।

মুসনাদে আহমাদের মধ্যে একটি মারফু হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “এই ব্যাপারে আমাদের উপর ইয়াহূদীদের খুবই হিংসা রয়েছে যে, আমাদেরকে জুম'আর দিনের তাওফীক প্রদান করা হয়েছে এবং তারা তা থেকে ভ্রষ্ট হয়ে গেছে। আর এর উপর যে, আমাদের কিবলাহ এইটি এবং তারা এর থেকে ভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে। আমাদের সজোরে ‘আমীন' বলার উপরেও তাদের বড়ই হিংসা রয়েছে, যা আমরা ইমামের পিছনে বলে থাকি।'অতঃপর আল্লাহ তা'আলা বলেন যে, হে উম্মতে মুহাম্মদী (সঃ)! তোমাদেরকে এই পছন্দনীয় কিবলার দিকে ফিরাবার কারণ এই যে, তোমরা নিজেও পছন্দনীয় উম্মত। তোমরা কিয়ামতের দিন অন্যান্য উম্মতের উপর সাক্ষী স্বরূপ দাঁড়াবে।

কেননা তারা সবাই তোমাদের মর্যাদা স্বীকার করে। (আরবি)-এর অর্থ এখানে ভাল ও উত্তম। যেমন বলা হয়ে থাকে যে, কুরাইশ বংশ হিসেবে (আরবি) অর্থাৎ আরবের মধ্যে উত্তম। এটাও বলা হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) স্বীয় গোত্রের মধ্যে (আরবি) ছিলেন অর্থাৎ সম্ভ্রান্ত বংশ সম্পন্ন ছিলেন। (আরবি)অর্থাৎ শ্রেষ্ঠতম নামায, যেটা আসরের নামায, এটা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত আছে। সমস্ত উম্মতের মধ্যে উম্মতে মুহাম্মদীই (সঃ) সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বলে তাদেরকে পূর্ণাঙ্গ শরীয়তও দেয়া হয়েছে, সম্পূর্ণ সরল ও সঠিক পথও দেয়া হয়েছে এবং অতি স্পষ্ট ধর্মও দেয়া হয়েছে। এই জন্যেই মহান আল্লাহ ঘোষণা করছেনঃ (আরবি) অর্থাৎ সেই আল্লাহ তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন এবং তোমাদের ধর্মে কোন সংকীর্ণতা রাখেননি।

তোমরা তোমাদের আদি পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর ধর্মের উপরে রয়েছ এবং তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন মুসলমান। এর পূর্বেও এবং এর মধ্যেও যেন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তোমাদের উপর সাক্ষী হন, আর তোমরা সাক্ষী হও অন্যান্য উম্মতের উপর।' মুসনাদ-ইআহমাদের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন হযরত নুহ (আঃ) কে ডাকা হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি কি আমার বার্তা আমার বান্দাদের নিকট পৌছিয়ে দিয়েছিলে?' তিনি বলবেনঃ হে প্রভু! হাঁ, আমি পৌছিয়ে দিয়েছি।' অতঃপর তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে এবং তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ নূহ (আঃ) কি তোমাদের নিকট আমার বাণী পৌছিয়ে দিয়েছিল? তারা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করবে এবং বলবে আমাদের নিকট কোন ভয় প্রদর্শক আসেননি।

তখন হযরত নূহ (আঃ)-কে বলা হবেঃ তোমার উম্মত তো অস্বীকার করছে সুতরাং তুমি সাক্ষী হাযির কর। তিনি বললেনঃ হ, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত আমার সাক্ষী'। (আরবি) আয়াতটির ভাবার্থ এটাই (আরবি) শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আদল’ ও ‘ইনসাফ'। এখন তোমাদেরকে আহবান করা হবে এবং তোমরা সাক্ষ্য প্রদান করবে, আর আমি তোমাদের অনুকূলে সাক্ষ্য দেব (সহীহ বুখারী, জামেউত্ তিরমিযী, সুনান-ই-নাসায়ী, সুনান ই ইবনে মাজাহ)। মুসনাদে আহমাদের আর একটি বর্ণনায় রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “কিয়ামতের দিন নবী আসবেন এবং তার সাথে তাঁর উম্মতের শুধু মাত্র দুটি লোকই থাকবে কিংবা তার চেয়ে বেশী। তাঁর উম্মতকে আহবান করা হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবেঃ এই নবী কি তোমাদের নিকট ধর্ম প্রচার করে ছিলেন?' তারা অস্বীকার করবে।

নবীকে তখন জিজ্ঞেস করা হবেঃ তুমি ‘তাবলীগ’ করেছিলে কি? তিনি বলবেন হ’। তাকে বলা হবেঃ তোমার সাক্ষী কে আছে?' তিনি বলবেন, মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মত।' অতঃপর মুহাম্মদ (সঃ) ও তাঁর উম্মতকে ডাকা হবে। তাদেরকে এই প্রশ্নই করা হবে যে, এই নবী প্রচার কার্য চালিয়ে ছিলেন কি? তারা বলবেন হাঁ। তখন তাদেরকে বলা হবেঃ ‘তোমরা কি করে জানলে?' তারা উত্তর দেবেঃ আমাদের নিকট নবী আগমন করেছিলেন এবং তিনিই আমাদেরকে জানিয়ে ছিলেন যে, নবীগণ তাঁদের উম্মতের নিকট প্রচার কার্য চালিয়েছিলেন। এটাই হচ্ছে আল্লাহ তাআলার (আরবি) এই কথার ভাবার্থ।' মুসনাদে আহমাদের আরও একটি হাদীসে রয়েছে যে, (আরবি) এর অর্থ হচ্ছে (আরবি) অর্থাৎ যারা ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত।

' তাফসীর ইবনে মিরদুওয়াই ও মুসনাদ-ই-ইবনে আবি হাতিমের মধ্যে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “কিয়ামতের দিন আমি ও আমার উম্মত উঁচু টিলার উপর অবস্থান করবো এবং সমস্ত মাখলুকের মধ্যে স্পষ্ট প্রতীয়মান হবো এবং সকলকেই দেখতে থাকবো। সেই দিন সবাই এই আকাংখা পোষণ করবে যে, যদি তারাও আমাদের অন্তর্ভুক্ত হতো।যে যে নবীকে তাদের কওম’ অবিশ্বাস করেছিল, আমরা মহান আল্লাহর দরবারে সাক্ষ্য প্রদান করবো যে, এই সব নবী তাদের রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।' মুস্তাদরিক-ই-হাকিম নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন ‘বানী মাসলামা গোত্রের একটি লোকের জানাযায় রাসূলুল্লাহ (সঃ) উপস্থিত হন।

আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর পার্শ্বে ছিলাম। তাদের মধ্যে কোন একটি লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল! এই লোকটি খুবই সৎ, খোদাভীরু পুণ্যবান এবং খাঁটি মুসলমান ছিল। এভাবে সে তার অত্যন্ত প্রশংসা করে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তুমি একথা কি করে বলছো?' লোকটি বলেঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! গুপ্ত ব্যাপারতো আল্লাহ তাআলাই জানেন। কিন্তু বাহ্যিক ব্যাপার তার এরূপই ছিল। নবী (সঃ) বলেনঃ ‘এটা তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। অতঃপর তিনি বানু হারিসার একটি জানাযায় উপস্থিত হন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তাদের মধ্যে একজন লোক বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এই লোকটি খুবই মন্দ ছিল। সে ছিল খুবই কর্কশ ভাষী এবং মন্দ চরিত্রের অধিকারী।

' রাসূলুল্লাহ (সঃ) তার দুর্নাম শুনে বলেন, 'তুমি কিভাবে একথা বলছছ?' সেই লোকটিও ঐ কথা বলে। রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ তার জন্যে এটা ওয়াজিব হয়ে গেল।হযরত মুসআব বিন সাবিত (রাঃ) বলেনঃ এই হাদীসটি শুনে মুহাম্মদ বিন কা'ব (রঃ) আমাদেরকে বলেনঃ আল্লাহর রাসূল (সঃ) সত্যই বলেছেন। অতঃপর তিনি (আরবি) এ আয়াতটি পাঠ করেন। মুসনাদে আহমাদ’ নামক হাদীস গ্রন্থে রয়েছে, আবুল আসওয়াদ (রঃ) বলেনঃ “আমি একবার মদীনায় আগমন করি। এখানে রোগ ছড়িয়ে পড়ে। বহু লোক মরতে থাকে। আমি হযরত উমার বিন খাত্তাব (রাঃ)-এর পাশে বসেছিলাম। এমন সময় একটি জানাযা যেতে থাকে। জনগণ মৃত ব্যক্তির প্রশংসা করতে আরম্ভ করে।

হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। ইতিমধ্যে আর একটি জানাযা বের হয়। লোকেরা তার দুর্নাম করতে শুরু করে।' হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ “তার জন্যে ওয়াজিব হয়ে গেল। আমি বলিঃ হে আমিরুল মুমেনিন! কি ওয়াজিব হয়ে গেল?' তিনি বলেনঃ “আমি ঐ কথাই বললাম যা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন। তিনি বলেছেনঃ চারজন লোক যে মুসলমানের ভাল কাজের সাক্ষ্য প্রদান করবে, আল্লাহ তা'আলা তাকে বেহেস্তে প্রবেশ করাবেন।' আমরা বলি-'হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যদি তিন ব্যক্তি সাক্ষ্য দেয়? তিনি বলেনঃ “তিন জন দিলেও।' আমরা বলি যদি দুইজন দেয়?' তিনি বলেনঃ ‘দুইজন দিলেও। অতঃপর আমরা আর একজনের ব্যাপারে প্রশ্ন করিনি।

তাফসীর-ই-ইবনে মিরদুওয়াই-এর একটি হাদীসের মধ্যে রয়েছে, হযরত যুহাইর সাকাফী (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ ‘অতি সত্বরই তোমরা তোমাদের ভাল ও মন্দ জেনে নেবে। জনগণ বলেঃ হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কিরূপে (জানবে)? রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেনঃ পৃথিবীর উপর তোমরা ভাল ও মন্দ প্রশংসা দ্বারা আল্লাহর সাক্ষীরূপে গণ্য হচ্ছে। অতঃপর আল্লাহ তাআলা বলেনঃ ‘প্রথম কিবলাহ্ শুধুমাত্র পরীক্ষামূলক ছিল। অর্থাৎ প্রথমে বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ্ নির্ধারিত করে পরে কা'বা শরীফকে কিবলাহ্ রূপে নির্ধারণ করা শুধু এই জন্যই ছিল যে, এর দ্বারা সত্য অনুসারীর পরিচয় পাওয়া যায়।

আর তাকেও চেনা যায় যে এর কারণে ধর্ম হতে ফিরে যায়। এটা বাস্তবিকই কঠিন কাজ ছিল, কিন্তু যাদের অন্তরে ঈমানের দৃঢ়তা রয়েছে, যারা রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর সত্যানুসারী, যারা বিশ্বাস রাখে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) যা যা বলেন তা সত্য, যাদের এই বিশ্বাস আছে যে, আল্লাহ তা'আলা যা চান তাই করে থাকেন, তিনি বান্দাদের উপর যে নির্দেশ দেয়ার ইচ্ছা করেন সেই নির্দেশই দিয়ে থাকেন এবং যে নির্দেশ উঠিয়ে নেয়ার ইচ্ছা করেন তা উঠিয়ে নেন, তাঁর প্রত্যেক কাজ নিপুণতায় পরিপূর্ণ, তাদের জন্যে এই নির্দেশ পালন মোটেই কঠিন নয়। তবে যাদের অন্তর রোগাক্রান্ত তাদের কাছে কোন নতুন নির্দেশ এলেই তো তাদের নতুন ব্যথা উঠে পড়ে।

কুরআন মাজীদের মধ্যে অন্য জায়গায় রয়েছেঃ যখনই কোন সূরা অবতীর্ণ হয় তখন তাদের মধ্যে কেউ বলে-এর দ্বারা কার ঈমান বৃদ্ধি পেয়েছে?’ প্রকৃত ব্যাপার এই যে, ঈমানদারগণের ঈমান বৃদ্ধি পেয়ে থাকে এবং তাদের মনের আনন্দও বৃদ্ধি পায়। আর রোগাক্রান্ত অন্তর বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অপবিত্রতার মধ্যে আরও বেড়ে যায়। আল্লাহ তা'আলা অন্য জায়গায় বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ “হে নবী (সঃ)! তুমি বল-ঈমানদারদের জন্যে এটা সুপথ প্রাপ্তি ও রোগ মুক্তির কারণ এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করে না, তাদের কর্ণসমূহে বধিরতা ও চক্ষুসমূহে অন্ধত্ব রয়েছে।' (৪১:৪৪) অন্য স্থানে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবি)অর্থাৎ আমি এমন কুরআন অবতীর্ণ করেছি যা ঈমানদারদের জন্যে শিফা ও রহমত স্বরূপ, এবং এটা দ্বারা অত্যাচারীদের শুধু অনিষ্টই বর্ধিত হয়।

' (১৭৪৮২) এ ঘটনাতেও সমস্ত মহান সাহাবী (রাঃ) স্থির ছিলেন। যেসব মুহাজির (রাঃ) ও আনসার (রাঃ) প্রথম দিকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন তারা উভয় কিবলাহর দিকে মুখ করেই নামায পড়েছেন। উপরে বর্ণিত হাদীস দ্বারা এটা জানা গেছে যে, নির্দেশ পাওয়া মাত্রই নামাযের মধ্যেই তাঁরা কাবার দিকে ফিরে গেছেন। মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা রুকুর অবস্থায় ছিলেন এবং ঐ অবস্থাতেই কাবার দিকে ফিরে যান। এর দ্বারা আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি তাদের পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পাচ্ছে। অতঃপর ইরশাদ হচ্ছেঃ “আল্লাহ তোমাদের ঈমান নষ্ট করবেন না, অর্থাৎ তোমরা বায়তুল মুকাদ্দাসকে কিবলাহ করে যেসব নামায আদায় করেছো,ওর পুণ্য থেকে আমি তোমাদেরকে বঞ্চিত করবো না।

হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর দ্বারা বরং তাদের উচ্চমানের ঈমানদারী সাব্যস্ত হয়েছে। তাদেরকে দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায পড়ার পুণ্য দেয়া হবে। এর ভাবার্থ এটাও বর্ণনা করা হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা মুহাম্মদ (সঃ)-কে এবং তাঁর সাথে তোমাদের ঘুরে যাওয়াকে নষ্ট করবেন না। এর পর বলা হচ্ছেঃ নিশ্চয় আল্লাহ মানবগণের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু। সহীহ হাদীসে রয়েছে, একটি বন্দিনী স্ত্রী লোকের শিশু তার থেকে পৃথক হয়ে পড়ে। এই স্ত্রী লোকটিকে রাসূলুল্লাহ (সঃ) দেখেন যে, সে উন্মাদিনির ন্যায় শিশুকে খুঁজতে রয়েছে। তাকে খুঁজে না পেয়ে সে বন্দীদের মধ্যে যে শিশুকেই দেখতে পায় তাকেই গলায় জড়িয়ে ধরে।

অবশেষে সে তার শিশুকে পেয়ে যায়। ফলে সে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ে এবং লাফিয়ে গিয়ে তাকে কোলে উঠিয়ে নেয়। অতঃপর তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে সোহাগ করতে থাকে এবং মুখে দুধ দেয়। এটা দেখে রাসূলুল্লাহ (সঃ) সাহাবীগণকে (রাঃ) বলেন, আচ্ছা বলতো এই স্ত্রী লোকটি কি তার এই শিশুটিকে আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে?' তাঁরা বলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! কখনই না। তিনি তখন বলেনঃ আল্লাহর শপথ! এই মা তার শিশুর উপর যতটা স্নেহশীল, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দাদের উপর এর চেয়ে বহু গুণে স্নেহশীল ও দয়ালু।

Tafsir in other languages · 7