এই আয়াতের তাফসীর

সূরা ৯ : আয়াত ৭৯

সূরা ৯ : আয়াত ৭৯

ٱلَّذِينَ يَلْمِزُونَ ٱلْمُطَّوِّعِينَ مِنَ ٱلْمُؤْمِنِينَ فِى ٱلصَّدَقَـٰتِ وَٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ إِلَّا جُهْدَهُمْ فَيَسْخَرُونَ مِنْهُمْ ۙ سَخِرَ ٱللَّهُ مِنْهُمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ

মু’মিনদের মধ্যে যারা সন্তুষ্টচিত্তে সদাকাদেয় এবং যারা নিজ কষ্ট ও শ্রম ছাড়া কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ ও ঠাট্টা-বিদ্রুপ করে, আল্লাহও তাদেরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করেন(৩০) এবং তাদের জন্যই রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।

তাফসীর ইবনে কাসীর

এটাও মুনাফিকদের একটি বদ অভ্যাস যে, তাদের মুখের ভাষা থেকে দাতা বা কৃপণ কেউই বাঁচতে পারে না। এই দোষযুক্ত ও কর্কশভাষী লোকগুলো খুবই নিকৃষ্ট শ্রেণীর লোক। যদি কোন ব্যক্তি একটা মোটা অংকের অর্থ আল্লাহর পথে দান করে তবে এরা তাকে রিয়াকার বলতে থাকে। আর কেউ যদি সামান্য মাল নিয়ে আসে তবে তারা বলে যে, এই ব্যক্তির দানের আল্লাহ মুখাপেক্ষী নন। যখন সাদকা দেয়ার আয়াত অবতীর্ণ হয় তখন সাহাবীগণ নিজ নিজ সাদকা নিয়ে হাযির হয়ে যান। এক ব্যক্তি প্রাণ খুলে খুব বড় অংকের সাদকা দেন। তখন ঐ মুনাফিকরা তার উপাধি দেয় রিয়াকার। অতঃপর একজন দরিদ্র লোক শুধুমাত্র এক সা’ (ঐ সময় আরবে দু’প্রকার সা’-এর প্রচলন ছিল।

একটি হিজাযী সা’, যার ওজন ছিল পাকা দু’সের এগারো ছটাক। আর একটি ছিল ইরাকী সা', যার ওজন ছিল পাকা তিন সের ছয় ছটাক) শস্য নিয়ে আসেন। তা দেখে মুনাফিকরা বলে যে, তার এটুকু জিনিসের আল্লাহ তা'আলার কি প্রয়োজন ছিল। এরই বর্ণনা এই আয়াতে রয়েছে।একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) বাকী’তে বলেনঃ “যে ব্যক্তি সাদকা প্রদান করবে, আমি কিয়ামতের দিন তার ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করবো।” ঐ সময় একজন সাহাবী নিজের পাগড়ীর মধ্য থেকে কিছু দিতে চাইলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তিনি তা বেঁধে নিলেন । ইত্যবসরে একজন অত্যন্ত কালো বর্ণের বেঁটে লোক একটি উন্ত্রী নিয়ে আসলেন, যার চেয়ে উত্তম উস্ত্রী সারা বাকীতে ছিল না ।

এসে তিনি বলতে লাগলেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! এটা আমি আল্লাহর নামে খয়রাত করলাম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) তখন বললেনঃ “বেশ, বেশ, খুব ভালো।” লোকটি বললেনঃ “নেন, এটা গ্রহণ করুন!” তখন একটি লোক বললোঃ “উষ্ট্ৰীটি তো এর চেয়ে উত্তম।” রাসূলুল্লাহ (সঃ) এটা শুনতে পেয়ে বলেনঃ “তুমি মিথ্যা বলছো। সে বরং তোমার চেয়ে এবং উজ্জ্বীটির চেয়ে বহুগুণে উত্তম।” অতঃপর তিনি বললেনঃ “তোমার মত শত শত উটের মালিকের জন্যে আফসোস!” এ কথা তিনি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ “শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তি দায়িত্বমুক্ত যে তার মাল দ্বারা এরূপ এরূপ করে (অর্থাৎ দান-খয়রাত করে)।”এ কথা বলার সময় তিনি অঞ্জলি ভরে ভরে নিজের হাত দ্বারা ডানে ও বামে ইশারা করেন।

অর্থাৎ আল্লাহর পথে প্রত্যেক ভাল কাজে খরচ করে। অতঃপর তিনি বলেনঃ “ঐ ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে অল্প মালের অধিকারী এবং অধিক ইবাদতকারী।” এ কথা তিনি তিনবার বলেন।এ আয়াতের ব্যাপারে আলী ইবনে আবি তালহা (রাঃ) ইবনে আব্বাস (রাঃ)। হতে বর্ণনা করেছেন যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) চল্লিশ ঊকিয়া (উকিয়ার ওজন হচ্ছে এক তোলা সাত মাশা) সোনা নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর নিকট আগমন করেন এবং একজন (দরিদ্র) আনসারী এক সা’ খাদ্য নিয়ে আসেন। তখন কোন কোন মুনাফিক বলেঃ “আল্লাহর শপথ! আব্দুর রহমান (রাঃ) যা এনেছে তা রিয়া (লোক-দেখাননা) ছাড়া কিছুই নয়।” আর ঐ আনসারী সম্পর্কে তারা বলেঃ “নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাঃ) এই সা’-এর মুখাপেক্ষী নন।

” ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একদা রাসূলুল্লাহ (সঃ) জন-সম্মুখে বের হয়ে ঘোষণা করেনঃ “তোমরা তোমাদের সাদকাগুলো জমা কর।” তখন জনগণ তাদের সাদকাগুলো জমা করেন। সর্বশেষ একটি লোক এক সা' খেজুর নিয়ে হাযির হন এবং বলেন- “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! রাত্রে বোঝা বহন করার বিনিময়ে আমি দু'সা' খেজুর লাভ করেছিলাম। এক সা' আমার সন্তানদের জন্যে রেখে বাকী এক সা’ আপনার কাছে নিয়ে এসেছি।” রাসুলুল্লাহ (সঃ) তখন তাঁর ঐ মালকে জমাকৃত মালের মধ্যে ঢেলে দিতে বললেন। মুনাফিকরা তখন বলাবলি করতে লাগলো যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সঃ)-এই এক সা' খেজুরের মুখাপেক্ষী নন। অতঃপর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “সাদকা দানকারীদের আর কেউ অবশিষ্ট আছে।

কি?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তরে বললেনঃ “তুমি ছাড়া আর কেউ অবশিষ্ট নেই।” তখন আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) বললেনঃ, “আমার কাছে একশ’ উকিয়া সোনা রয়েছে, সবগুলো আমি সাদকা করে দিলাম।” উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) তখন তাকে বললেনঃ “তুমি কি পাগল?” তখন তিনি উত্তরে বললেনঃ “আমার মধ্যে পাগলামি নেই। আমি যা করলাম সজ্ঞানেই করলাম।” উমার (রাঃ) বললেনঃ “তুমি যা করলে তা চিন্তা করে দেখেছো কি?” তিনি উত্তর দিলেনঃ “হ্যা শুনুন! আমার মাল রয়েছে আট হাজার। চার হাজার আমি আল্লাহ তা'আলাকে ঋণ দিচ্ছি এবং বাকী চার হাজার নিজের জন্য রাখছি।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) বললেনঃ “তুমি যা রাখলে এবং যা দান করলে তাতে আল্লাহ বরকত দান করুন!” মুনাফিকরা তখন বলতে লাগলোঃ “আল্লাহর কসম! আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) যা দান করলেন তা রিয়া ছাড়া কিছুই নয়।

” আল্লাহ তা'আলা আয়াত নাযিল করে বড় ও ছোট দানকারীদের সত্যবাদিতা এবং মুনাফিকদের কষ্টদায়ক কথা প্রকাশ করে দিলেন। বানু আজলান গোত্রের আসিম ইবনে আদী (রাঃ) নামক একটি লোকও মোটা অংকের দান করেছিলেন। তিনি দান করেছিলেন একশ’ অসক খেজুর । মুনাফিকরা তাঁকে রিয়াকার বলেছিল। আবূ আকীল (রাঃ) নিজের পারিশ্রমিক ও মজুরীর অংশ হতে সামান্য দান করেছিলেন। তিনি ছিলেন বানু আনীফ গোত্রের লোক । তিনি এক সা’ পরিমাণ জিনিস দান করলে মুনাফিকরা তাকে উপহাস ও নিন্দা করে। অন্য এক বর্ণনায় আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) মুজাহিদদের একটি দলকে যুদ্ধে প্রেরণ করার উদ্দেশ্যে এই চাঁদা আদায় করেছিলেন। তাতে রয়েছে যে, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাঃ) দু'হাজার দিয়েছিলেন এবং দু'হাজাররেখেছিলেন।

অন্য একজন দরিদ্র লোক সারা রাত্রির পরিশ্রমের বিনিময়ে দু’সা’ খেজুর লাভ করেছিলেন। এক সা' নিজের জন্যে রেখে বাকী এক সা' তিনি দান করেন। এ লোকটির নাম ছিল আবু আকীল (রাঃ)। সারারাত ধরে তিনি নিজের পিঠের উপর বোঝা বহন করেছিলেন। কেউ কেউ বলেন যে, তাঁর নাম ছিল হাবাব (রাঃ), আর একটি উক্তি আছে যে, তাঁর নাম ছিল আব্দুর রহমান ইবনে সা'লাবা (রাঃ)।ঐ মনাফিকদের এই উপহাসের শাস্তিস্বরূপ আল্লাহ তাআলা তাদের থেকে এই প্রতিশোধই গ্রহণ করলেন। পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি। কেননা আমলের শাস্তি তো আমল অনুযায়ীই হয়ে থাকে।

অন্য ভাষার তাফসীর · ৭